নায়েবকে জিম্মি করে যাদবপুর ভূমি অফিসে শাহাজান-মামুন সিন্ডিকেটের রাজত্ব, ক্ষুব্ধ সেবাগ্রহীতারা
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অফিস নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের চরম হয়রানি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি, অফিসের পিওন মো. শাহাজানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রটি সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের অন্যতম প্রধান সহযোগী ও মাঠ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছেন মো. মামুন নামের এক প্রভাবশালী বহিরাগত ব্যক্তি। পিওন মো. শাহাজান অফিসের ভেতরের নথিপত্র ও ফাইলের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করেন, আর মো. মামুন বাইরের সাধারণ গ্রাহকদের ধরে এনে অতিরিক্ত অর্থ বা ঘুষের চুক্তি সম্পন্ন করেন। এই দুই ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত শাহাজান-মামুন সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ নাগরিকরা ভূমি সংক্রান্ত খতিয়ান, নামজারি (মিউটেশন) কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর প্রদানের মতো মৌলিক সেবা নিতে এসে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তি, মানসিক নির্যাতন ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।অনুসন্ধানে জানা যায়, যাদবপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের সরাসরি প্রবেশ এবং স্বাভাবিক নিয়মে সেবা পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। দালাল মো. মামুনের মাধ্যমে ফাইল জমা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয়। নামজারি বা খতিয়ানের ভুল সংশোধনের মতো সরকারি সাধারণ কাজের জন্য সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অতিরিক্ত অর্থ (ঘুষ) দাবি করে এই সিন্ডিকেট। পিওন মো. শাহাজান অফিসের ভেতরে বসে ফাইলের নানা ধরনের কৃত্রিম ত্রুটি তৈরি করেন, যা দেখিয়ে পরবর্তীতে মো. মামুন বাইরে এসে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেন। গ্রামের সাধারণ ও নিরক্ষর মানুষ জমি সংক্রান্ত জটিলতায় পড়লে এই চক্রটি তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে ফাইল গায়েব বা বাতিল করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে খোদ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তার (নায়েব) বক্তব্যে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ করে দাবি করেন, “পিওন মো. শাহাজান ও বহিরাগত মো. মামুন স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী। তারা সরকারি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখায়। আমাকে কার্যত জিম্মি করে পুরো অফিসের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক নিয়ন্ত্রণ তারা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। আমি বর্তমানে চরম নিরুপায় এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছি।” একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার এমন অসহায় আত্মসমর্পণ এবং পিওন মো. শাহাজান ও দালাল মো. মামুনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ার বিষয়টি এলাকার সাধারণ মানুষকে আরও বেশি আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।এদিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী মো. শাহাজান এবং বহিরাগত মো. মামুনের এমন একচ্ছত্র আধিপত্য ও কর্মকর্তার জিম্মি হওয়ার দাবিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। সেবা নিতে আসা একাধিক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরকারের ই-নামজারি বা ই-পর্চার জন্য আবেদন করলেও, ভূমি অফিসে এসে এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের বাড়তি টাকা না দিলে কাজ হয় না। মো. মামুন প্রকাশ্যে অফিসের টেবিল ও নথিপত্র নাড়াচাড়া করে এবং পিওন মো. শাহাজান তাকে সব ধরনের দাপ্তরিক তথ্য সরবরাহ করেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।সরকারি একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে যদি সত্যিই মো. শাহাজান ও মো. মামুনের মতো ব্যক্তিরা এভাবে বছরের পর বছর প্রভাব বিস্তার করে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন কেন কোনো আইনগত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নীরবতা বা মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকির অভাবই এই সিন্ডিকেটকে এতটা বেপরোয়া করে তুলেছে।অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত পিওন মো. শাহাজান ও মো. মামুনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর বা সন্তোষজনক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, এই অভিযোগের গভীরতা ও এর পেছনের মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচন করতে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।যাদবপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এই অরাজকতা ও শাহাজান-মামুন চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে এবং কার্যালয়টির প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসকের (ডিসি) জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। তারা অবিলম্বে এই কার্যালয়ে ঝটিকা অভিযান (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা করে পিওন মো. শাহাজান ও দালাল মো. মামুনসহ পুরো চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন