আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ বক্তব্যে তোলপাড়,দেশে ফিরে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী: ডা. জাহেদ উর রহমান
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশে নতুন করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিতর্ক সামনে এসেছে। এ বক্তব্যের পর রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কেউ কেউ আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
এদিকে, আইজিপির বক্তব্য নিয়ে সরকারের অবস্থান কী হবে এবং প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে সিদ্ধান্ত নেবেন—এমন বক্তব্য ডা. জাহেদ উর রহমান দিয়েছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যেভাবে বিতর্কের সূত্রপাত
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকায় কমিউনিটি ব্যাংকের একটি ইসলামিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির।
সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধ দমনে পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইন ও সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ক্রসফায়ারের প্রয়োজন হলে এবং সরকার অনুমতি দিলে তা করা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আইজিপির এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর তা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সমালোচকদের মতে, সরকারের অনুমতির শর্ত উল্লেখ করে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা তুলে ধরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
টিআইবির উদ্বেগ ও জবাবদিহির দাবি
আইজিপির বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, অপরাধ দমনের বিকল্প হিসেবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনা তুলে ধরা আইনের শাসন ও সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পেশাগত দক্ষতা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
সংস্থাটি আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্ত প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার দাবিও তুলেছে টিআইবি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া
আইজিপির বক্তব্যের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
তাদের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেই তাঁকে বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আদালতের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মানবাধিকার, সংবিধান ও প্রচলিত আইন মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যা
বিতর্কের পর পুলিশ সদর দপ্তর এক বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আইজিপি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার অর্থে ব্যবহার করেননি।
পুলিশ সদর দপ্তরের দাবি, মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের অঙ্গীকার বোঝাতেই তিনি ওই শব্দ ব্যবহার করেছেন।
বিবৃতিতে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সময় হামলার শিকার হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি জনগণের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পেশাদারত্ব বজায় রাখা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যার পরও আইজিপির বক্তব্যের ভাষা ও তাৎপর্য নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
সংবিধান ও আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ দমন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। পুলিশ অপরাধীকে গ্রেপ্তার, তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে; কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে অপরাধ দমনের নামে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনি সীমা ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা অপরিহার্য।
অতীতের বিভিন্ন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এবং এসব ঘটনায় জবাবদিহি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের কারণে আইজিপির সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে নজর
আইজিপির বক্তব্যের পর এখন সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান কী হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকারের নীতি, পুলিশের দায়িত্ব পালনের সীমা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্যের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডা. জাহেদ উর রহমানের নামে প্রচারিত শিরোনামে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হলেও এ বিষয়ে তাঁর নির্দিষ্ট বক্তব্যের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্য দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মানবাধিকার, সাংবিধানিক অধিকার ও পুলিশের জবাবদিহির প্রশ্নকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এখন সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কী অবস্থান জানানো হয়, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।
আপনার মতামত লিখুন