ক্যান্সার চিকিৎসার যন্ত্র স্থাপন ও অপসারণে দীর্ঘসূত্রিতা নয়, বাজেটের বড় অংশ ব্যয়ের ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
দেশে ক্যান্সার চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করতে আধুনিক চিকিৎসাযন্ত্র স্থাপন, বিকল যন্ত্রপাতি মেরামত এবং অকার্যকর সরঞ্জাম অপসারণের প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে ক্যান্সার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের বড় অংশ ব্যয়ের কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সরকারি হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট দূর করা এখন স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং চিকিৎসাসেবা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেক রোগীকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের অংশ হিসেবে সরকার ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে। গত ৭ অক্টোবর সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নতুন ১৭টি রেডিওথেরাপি যন্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে এবং বাকি ১১টি ঢাকার বাইরের হাসপাতালে স্থাপনের কথা রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও কারিগরি দক্ষতা তৈরিতেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়।
চিকিৎসাযন্ত্র স্থাপনে গতি আনার উদ্যোগ
ক্যান্সার চিকিৎসায় আধুনিক যন্ত্রপাতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রেডিওথেরাপির মাধ্যমে অনেক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু যন্ত্রপাতি স্থাপনে বিলম্ব, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব কিংবা কারিগরি জনবল না থাকলে এসব সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।
এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন যন্ত্র স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান যন্ত্রপাতি সচল রাখা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং অচল সরঞ্জাম দ্রুত মেরামত বা প্রয়োজন অনুযায়ী অপসারণের ব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি। এতে হাসপাতালের সেবাদানের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ও কমানো সম্ভব হবে।
ঢাকার বাইরেও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য
বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রাজধানীনির্ভরতা কমানো দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে গিয়ে রোগীদের যাতায়াত, আবাসন ও চিকিৎসাব্যয় বহন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে চিকিৎসা শুরু করতেও দেরি হয়।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক রেডিওথেরাপি যন্ত্র স্থাপন করা হলে ঢাকার বাইরের রোগীদের নিজ নিজ অঞ্চলে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এ সুবিধা কার্যকর করতে দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট, প্রয়োজনীয় সহায়ক সরঞ্জাম এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাজেট ব্যয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন জবাবদিহি
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। যন্ত্রপাতি কেনার আগে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের অবকাঠামো, বিদ্যুৎব্যবস্থা, নিরাপত্তা, জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থাকার ঝুঁকি থাকে।
ক্যান্সার চিকিৎসায় বাজেটের বড় অংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বরাদ্দের পরিমাণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা, যন্ত্রপাতি স্থাপনের অগ্রগতি এবং রোগীদের চিকিৎসাব্যয় কতটা কমবে—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
রোগীদের প্রত্যাশা
ক্যান্সার রোগী ও তাঁদের স্বজনদের প্রধান প্রত্যাশা হলো দ্রুত রোগ নির্ণয়, সময়মতো চিকিৎসা শুরু এবং সাশ্রয়ী ব্যয়ে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া। আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হলে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা কমানো এবং সরকারি হাসপাতালের ওপর রোগীদের আস্থা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে পরিকল্পনার সুফল নিশ্চিত করতে শুধু নতুন যন্ত্র কেনাই যথেষ্ট নয়; সেগুলো দ্রুত স্থাপন, নিয়মিত সচল রাখা এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের ঘোষিত উদ্যোগগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং দেশের সাধারণ ক্যান্সার রোগীরা এর সুফল কতটা পান।
আপনার মতামত লিখুন