কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে আনসারের তণ্ডব: অসুস্থ স্ত্রীর সামনেই স্বামী ও ১৩ মাসের শিশুকে মারধরের অভিযোগ
রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে গিয়ে চরম হেনস্তা, মানসিক নির্যাতন ও শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন এক মানবাধিকার কর্মী ও তাঁর পরিবার। গত ২১ জুলাই (মঙ্গলবার) দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। এমনকি মায়ের কোলে থাকা মাত্র ১৩ মাস বয়সী এক অবোধ শিশুর গায়েও হাত তোলার অভিযোগ উঠেছে সেখানে দায়িত্বরত এক আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে। এই নির্মম ঘটনায় সাধারণ রোগী ও পথচারীদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার আদ্যোপান্ত: অসুস্থ স্ত্রীকে বসতে চাওয়ায় চড়াও আনসার
ভুক্তভোগী মানবাধিকার কর্মী ওমর ফারুক মিল্লাত জানান, গত মঙ্গলবার দুপুরে তিনি তাঁর স্ত্রী ও ১৩ মাস বয়সী অসুস্থ শিশুকে নিয়ে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। ডাক্তার দেখানো শেষে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর স্ত্রী হঠাৎ প্রচণ্ড ক্লান্তি ও অসুস্থতা বোধ করেন। হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেলায় তিনি পাশে থাকা একটি খালি চেয়ারে সামান্য সময়ের জন্য বসার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা তাঁকে বসার অনুমতি না দিয়ে অত্যন্ত অমানবিক আচরণ করে বাধা প্রদান করে।
এ সময় ওমর ফারুক তাঁর স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা ও মানবিক দিক বিবেচনা করে মাত্র কয়েক মিনিট বসার জন্য আকুল মিনতি ও বারবার অনুরোধ করেন। কিন্তু এতে বিন্দুমাত্র দয়া না দেখিয়ে উল্টো তীব্র ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে দায়িত্বরত আনসার সদস্য রহিদুল।
অবোধ শিশু ও বাবার ওপর হামলা, হিঁচড়ে নেওয়ার চেষ্টা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে আনসার সদস্য রহিদুল সম্পূর্ণ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সে মানবাধিকার কর্মী ওমর ফারুকের কোলে থাকা মাত্র ১৩ মাসের নিষ্পাপ শিশুটির ওপর চড়াও হয় এবং শিশুসহ বাবার গায়ে সজোরে থাপ্পড় মারে। শুধু তা-ই নয়, অসুস্থ স্ত্রীর সামনেই ওমর ফারুকের জামার কলার ধরে হিঁচড়ে ও ধাক্কাধাক্কি করে একটি বন্ধ কামরায় নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চালায়।
এ সময় শিশুর আর্তচিৎকার ও বাবার আকুতিতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আশপাশে থাকা সাধারণ রোগী, স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা দ্রুত এগিয়ে এসে আনসারের অমানবিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানান এবং ভুক্তভোগী পরিবারটিকে উদ্ধার করেন।
সোশাল মিডিয়ায় ভিডিও ভাইরাল: গণমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া
ঘটনার সময় উপস্থিত সচেতন সাধারণ মানুষ পুরো ন্যক্কারজনক দৃশ্যটি নিজেদের মোবাইল ফোনে ধারণ করেন। পরবর্তীতে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে নেটিজেনদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে চ্যানেল আই নিউজসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক জাতীয় গণমাধ্যম ও অনলাইন পোর্টালে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়।
পুলিশের তৎপরতা বনাম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘নির্মম উদাসীনতা’
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশের নজরে আসে। উত্তরা পূর্ব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) অনতিবিলম্বে ভুক্তভোগী পরিবারটিকে থানায় ডেকে পাঠান। ভুক্তভোগী ওমর ফারুক থানায় উপস্থিত হয়ে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও লিখিত অভিযোগ প্রদান করেন। ওসি বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নজিরবিহীন আখ্যা দিয়ে আশ্বস্ত করেন যে, অপরাধী আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ঘটনার পর থানা পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। প্রশাসনিকভাবে কোনো ধরনের সহযোগিতা তো দূরে থাক, উল্টো ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন না করে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জনমনে আতঙ্কের ছাপ: দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
সরকারি একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে এমন নির্মম নির্যাতন ও অবোধ শিশুর ওপর হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা প্রশ্ন তুলেছেন—সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ও সেবার নামে যদি এভাবে সাধারণ মানুষকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়, তবে মানুষ যাবে কোথায়?
ভুক্তভোগী পরিবার এবং সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী আনসার সদস্য রহিদুলসহ সংশ্লিষ্টদের চাকরিচ্যুত করা এবং কঠোর আইনগত শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন