সারদায় ২৪৬ শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ক্যাডেট এসআইয়ের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত
পেশাদারিত্ব ও মানবিক আচরণে ‘জনগণের পুলিশ’ গড়তে হবে:স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সারদা (রাজশাহী), ২৯ অক্টোবর ২০২৬: পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করে প্রকৃত অর্থে ‘জনগণের পুলিশ’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, পুলিশের প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং সেবাপ্রত্যাশী সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ব্যাচের ছয় মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জনগণের আস্থা অর্জনে গুরুত্বারোপ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। তাই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের আরও আন্তরিক, দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব হতে হবে। ভয়ভীতি, পক্ষপাতিত্ব কিংবা প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে প্রত্যেক নাগরিককে আইনি সেবা ও নিরাপত্তা দিতে হবে।
তিনি বলেন, মানুষের পাশে থেকে সেবা প্রদান এবং ন্যায়সংগত আচরণের মাধ্যমেই পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি করতে হবে। শুধু দায়িত্ব পালন করলেই হবে না, মানুষের কল্যাণে কাজ করে তাদের হৃদয়ও জয় করতে হবে।
পুলিশ বাহিনীকে আধুনিকায়নে সরকারের উদ্যোগ
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনাকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীকে দক্ষ, আধুনিক, মানবিক ও জনসেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, জনবল বৃদ্ধি, যানবাহন ক্রয়, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
অন্যায় ও বৈষম্য থেকে দূরে থাকার নির্দেশ
নবীন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষা, আইনি প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এই ব্যাচের সদস্যরা দেশসেবার গুরুত্বপূর্ণ পেশায় যোগ দিয়েছেন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে বৈষম্য, অন্যায় কিংবা অনৈতিক চর্চা থেকে দূরে থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের পোশাক ও অর্পিত দায়িত্বকে সাধারণ চাকরি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। এটি জনগণের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। সংবিধান ও প্রচলিত আইন মেনে দায়িত্ব পালন করতে হবে প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তাকে।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের তাগিদ
বর্তমান সময়ের অপরাধ পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, অনলাইন জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ পুলিশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এসব অপরাধ কার্যকরভাবে মোকাবিলায় প্রচলিত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক তদন্তপদ্ধতি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল ফরেনসিকের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্ব্যবহার, পক্ষপাতিত্ব ও পেশিশক্তির পরিবর্তে পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং মানবিক পুলিশিং নিশ্চিত করতে হবে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করাও পুলিশের দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজের সুযোগ, শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে শাস্তি
নবীন কর্মকর্তাদের পেশাগত সম্ভাবনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ পুলিশের বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে।
তবে দায়িত্বে অবহেলা, অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর থাকবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে নবীন কর্মকর্তাদের সফল পেশাগত জীবন গড়ে তোলা এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
কুচকাওয়াজে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল মো. মাইনুল হাসান বিপিএম, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্বে থাকা মো. রেজাউল আলম সরকার এবং রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আশিক সাঈদ।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আমন্ত্রিত অতিথি, প্রশিক্ষণার্থীদের অভিভাবক এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যারেড পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন। পরে প্রশিক্ষণের বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ক্যাডেট এসআইদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। কুচকাওয়াজে প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন এএসপি প্রবেশনার মো. মাহবুব হোসেন।
শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার পেলেন যারা
প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ব্যাচের মধ্যে বেস্ট সার্জেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন মোহা. ওমর ফারুক। বেস্ট একাডেমিক বিভাগে মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ বিভাগে সাইফুল ইসলাম এবং বেস্ট শ্যুটার বিভাগে মোহা. আসাদুজ্জামান পুরস্কার অর্জন করেন।
অন্যদিকে, ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ) থেকে বেস্ট ক্যাডেট নির্বাচিত হয়েছেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। বেস্ট একাডেমিক বিভাগে মো. বোরহানুল ইসলাম, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ বিভাগে দেওয়ান গোলাম রসুল এবং বেস্ট শ্যুটার বিভাগে মো. কামাল গনি পুরস্কার অর্জন করেন।
প্রশিক্ষণ শেষে কর্মজীবনে ২৪৬ নবীন পুলিশ কর্মকর্তা
বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, এবারের সমাপনী কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ব্যাচের ৮৪ জন এবং ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর ব্যাচের ১৬২ জনসহ মোট ২৪৬ জন প্রশিক্ষণার্থী তাদের মৌলিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন।
প্রশিক্ষণ শেষে বাস্তব কর্মজীবনে প্রবেশ করতে যাওয়া এসব নবীন কর্মকর্তার সামনে এখন জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অপেক্ষা করছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পেশাগত দক্ষতা, সততা, নিরপেক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে নবীন কর্মকর্তারা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
আপনার মতামত লিখুন