ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
English
ই-পেপার
ইছামতী

তৌফিক শেখ হত্যার বিচার,বন্ধ কারখানা চালু ও নিরপরাধ শ্রমিকদের মুক্তির আহ্বান

পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জামায়াতের



পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জামায়াতের
ছবি:সংগৃহীত

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকরের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে নিহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছে দলটি।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) পোশাকশিল্পের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারা এসব দাবি তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বলেন, দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, মজুরি নিয়ে বিরোধ, কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং একের পর এক কারখানা বন্ধের ঘটনা শুধু শ্রমিক-মালিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ ঘটনায় আহত শ্রমিক তৌফিক শেখ (২১) রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান জামায়াত নেতারা। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তাঁরা।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ জীবনযাত্রার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও শ্রমিকদের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে একজন শ্রমিকের পক্ষে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিকে যৌক্তিক উল্লেখ করে জামায়াত নেতারা বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তাঁর শ্রমের অধিকার। শ্রমিকের শ্রম ও উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে যে শিল্প ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, সেই শ্রমিকের জীবনমান উপেক্ষা করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

নেতারা জানান, সরকার গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। গত ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বর্তমান বাজারদর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বোর্ড নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশ দেবে। শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকরের দাবি জানান তাঁরা।

ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের নিন্দা, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে হামলা, লুটপাট ও উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত করার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়।

জামায়াত নেতারা বলেন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শিল্প ধ্বংসের অপতৎপরতা এক বিষয় নয়। কোনো কারখানা ধ্বংস করে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বরং এর ফলে শ্রমিকেরা কর্মসংস্থান হারান, মালিকেরা বিনিয়োগ হারান এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় অর্থনীতি।

চলমান শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিকলীগসহ কোনো রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠী উসকানি ও নাশকতার চেষ্টা করছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তাঁরা। তবে কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়া সাধারণ শ্রমিকদের দায়ী না করারও দাবি জানান নেতারা।

তাঁরা বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলন দমনের নামে হয়রানি, নির্যাতন, অযাচিত বলপ্রয়োগ ও গণগ্রেপ্তারের পথ পরিহার করতে হবে।

শ্রমিক নিহতের ঘটনায় বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি

গাজীপুরে পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শ্রমিকের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। শ্রমিকের ন্যায্য দাবির আন্দোলন চলাকালে কেন প্রাণহানির ঘটনা ঘটল, কারা এর জন্য দায়ী এবং কী পরিস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটেছে, তা নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা, আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারকে যথাযথ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

পোশাকশিল্পে সংকট, উদ্বেগে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি

সংবাদ সম্মেলনে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়, এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান, জীবন-জীবিকা এবং অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ জড়িত।

বিজিএমইএ ও সংশ্লিষ্ট শিল্প সূত্রে প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে জামায়াত নেতারা জানান, চলমান পরিস্থিতিতে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সহস্রাধিক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। শত শত কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি।

এ ছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।

নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল, সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

তাঁরা বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, কারখানার নিরাপত্তা রক্ষা এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ত্রিপক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান

শ্রমিক ও মালিকপক্ষকে মুখোমুখি অবস্থানে না দাঁড় করিয়ে পারস্পরিক আলোচনা, আস্থা, সহমর্মিতা ও সমঝোতার ভিত্তিতে সংকট সমাধানের আহ্বান জানায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হলে তাঁদের জীবনমান উন্নত হবে, কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি বাড়বে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং শিল্পে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। অন্যদিকে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, বিনিয়োগের সুরক্ষা, উৎপাদন পরিবেশের উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাও জরুরি।

এ জন্য সরকারকে কার্যকর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিকপক্ষ ও সরকারের মধ্যে দ্রুত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ আয়োজনের দাবি জানানো হয়।

পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির নিয়মিত পর্যালোচনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণের কথাও বলা হয়।

সরকারের প্রতি জামায়াতের ১৫ দফা দাবি

পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসন, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি ১৫ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো—

১. নবগঠিত মজুরি বোর্ডকে শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। নির্ধারিত মজুরি ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করতে হবে।

২. গাজীপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৩. কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নাশকতা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর অযাচিত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে।

৫. চলমান শ্রম অসন্তোষের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

৬. রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ের কারণে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

৭. শ্রমিক, কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৮. পোশাকশিল্পের সংকট নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে নিয়ে অবিলম্বে কার্যকর সংলাপের আয়োজন করতে হবে।

৯. শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ কিংবা অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি, ষড়যন্ত্র ও নাশকতার অপচেষ্টা থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করতে হবে।

১০. বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালুর উদ্যোগ নিতে হবে এবং শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনতে হবে।

১১. অন্যায় ও বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে। কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে তাঁদের পুনরায় কাজের সুযোগ দিতে হবে।

১২. শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, ওভারটাইম ও অন্যান্য আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।

১৩. পোশাকশ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।

১৪. নারী শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

১৫. দেশের পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের চাকরি, মালিকদের বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় শ্রমিক-মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।

শ্রমিক ও মালিক উভয়ের স্বার্থ রক্ষার আহ্বান

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে জামায়াত নেতারা বলেন, শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পের সুরক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়। শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বাঁচবে। শ্রমিককে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে শিল্পে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আবার ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমেও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

সরকারের প্রতি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন, শ্রমিক হত্যার সুষ্ঠু বিচার, নিরপরাধ শ্রমিকদের মুক্তি এবং বন্ধ কারখানা চালুর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

পোশাকশিল্পের মালিকদের প্রতি শ্রমিকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং শিল্পের অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে তাঁদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।

একই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতি আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ধারায় পরিচালনা এবং নাশকতা, সহিংসতা ও উসকানির সুযোগ না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

নেতারা আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে পোশাকশিল্পের চলমান সংকট উত্তরণ সম্ভব। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়ভিত্তিক শ্রমব্যবস্থা গঠন, শিল্পের স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির সুরক্ষায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখবে, ইনশাআল্লাহ।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. আবদুর রব, অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মো. সেলিম উদ্দিন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সেক্রেটারি আবদুস সাত্তার সুমনসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

আপনার মতামত লিখুন

ইছামতী

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জামায়াতের

প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকরের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে নিহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছে দলটি।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) পোশাকশিল্পের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারা এসব দাবি তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বলেন, দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, মজুরি নিয়ে বিরোধ, কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং একের পর এক কারখানা বন্ধের ঘটনা শুধু শ্রমিক-মালিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ ঘটনায় আহত শ্রমিক তৌফিক শেখ (২১) রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান জামায়াত নেতারা। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তাঁরা।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ জীবনযাত্রার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও শ্রমিকদের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে একজন শ্রমিকের পক্ষে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিকে যৌক্তিক উল্লেখ করে জামায়াত নেতারা বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তাঁর শ্রমের অধিকার। শ্রমিকের শ্রম ও উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে যে শিল্প ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, সেই শ্রমিকের জীবনমান উপেক্ষা করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

নেতারা জানান, সরকার গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। গত ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বর্তমান বাজারদর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বোর্ড নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশ দেবে। শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকরের দাবি জানান তাঁরা।

ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের নিন্দা, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে হামলা, লুটপাট ও উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত করার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়।

জামায়াত নেতারা বলেন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শিল্প ধ্বংসের অপতৎপরতা এক বিষয় নয়। কোনো কারখানা ধ্বংস করে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বরং এর ফলে শ্রমিকেরা কর্মসংস্থান হারান, মালিকেরা বিনিয়োগ হারান এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় অর্থনীতি।

চলমান শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিকলীগসহ কোনো রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠী উসকানি ও নাশকতার চেষ্টা করছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তাঁরা। তবে কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়া সাধারণ শ্রমিকদের দায়ী না করারও দাবি জানান নেতারা।

তাঁরা বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলন দমনের নামে হয়রানি, নির্যাতন, অযাচিত বলপ্রয়োগ ও গণগ্রেপ্তারের পথ পরিহার করতে হবে।

শ্রমিক নিহতের ঘটনায় বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি

গাজীপুরে পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শ্রমিকের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। শ্রমিকের ন্যায্য দাবির আন্দোলন চলাকালে কেন প্রাণহানির ঘটনা ঘটল, কারা এর জন্য দায়ী এবং কী পরিস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটেছে, তা নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা, আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারকে যথাযথ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

পোশাকশিল্পে সংকট, উদ্বেগে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি

সংবাদ সম্মেলনে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়, এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান, জীবন-জীবিকা এবং অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ জড়িত।

বিজিএমইএ ও সংশ্লিষ্ট শিল্প সূত্রে প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে জামায়াত নেতারা জানান, চলমান পরিস্থিতিতে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সহস্রাধিক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। শত শত কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি।

এ ছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।

নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল, সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

তাঁরা বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, কারখানার নিরাপত্তা রক্ষা এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ত্রিপক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান

শ্রমিক ও মালিকপক্ষকে মুখোমুখি অবস্থানে না দাঁড় করিয়ে পারস্পরিক আলোচনা, আস্থা, সহমর্মিতা ও সমঝোতার ভিত্তিতে সংকট সমাধানের আহ্বান জানায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হলে তাঁদের জীবনমান উন্নত হবে, কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি বাড়বে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং শিল্পে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। অন্যদিকে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, বিনিয়োগের সুরক্ষা, উৎপাদন পরিবেশের উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাও জরুরি।

এ জন্য সরকারকে কার্যকর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিকপক্ষ ও সরকারের মধ্যে দ্রুত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ আয়োজনের দাবি জানানো হয়।

পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির নিয়মিত পর্যালোচনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণের কথাও বলা হয়।

সরকারের প্রতি জামায়াতের ১৫ দফা দাবি

পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসন, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি ১৫ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো—

১. নবগঠিত মজুরি বোর্ডকে শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। নির্ধারিত মজুরি ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করতে হবে।

২. গাজীপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৩. কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নাশকতা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর অযাচিত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে।

৫. চলমান শ্রম অসন্তোষের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

৬. রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ের কারণে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

৭. শ্রমিক, কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৮. পোশাকশিল্পের সংকট নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে নিয়ে অবিলম্বে কার্যকর সংলাপের আয়োজন করতে হবে।

৯. শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ কিংবা অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি, ষড়যন্ত্র ও নাশকতার অপচেষ্টা থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করতে হবে।

১০. বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালুর উদ্যোগ নিতে হবে এবং শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনতে হবে।

১১. অন্যায় ও বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে। কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে তাঁদের পুনরায় কাজের সুযোগ দিতে হবে।

১২. শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, ওভারটাইম ও অন্যান্য আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।

১৩. পোশাকশ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।

১৪. নারী শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

১৫. দেশের পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের চাকরি, মালিকদের বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় শ্রমিক-মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।

শ্রমিক ও মালিক উভয়ের স্বার্থ রক্ষার আহ্বান

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে জামায়াত নেতারা বলেন, শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পের সুরক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়। শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বাঁচবে। শ্রমিককে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে শিল্পে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আবার ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমেও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

সরকারের প্রতি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন, শ্রমিক হত্যার সুষ্ঠু বিচার, নিরপরাধ শ্রমিকদের মুক্তি এবং বন্ধ কারখানা চালুর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

পোশাকশিল্পের মালিকদের প্রতি শ্রমিকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং শিল্পের অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে তাঁদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।

একই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতি আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ধারায় পরিচালনা এবং নাশকতা, সহিংসতা ও উসকানির সুযোগ না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

নেতারা আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে পোশাকশিল্পের চলমান সংকট উত্তরণ সম্ভব। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়ভিত্তিক শ্রমব্যবস্থা গঠন, শিল্পের স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির সুরক্ষায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখবে, ইনশাআল্লাহ।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. আবদুর রব, অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মো. সেলিম উদ্দিন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সেক্রেটারি আবদুস সাত্তার সুমনসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।



ইছামতী

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরমান চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ইছামতী