ঢাকা   রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
English
ই-পেপার
ইছামতী

শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবিতে সংঘর্ষ,ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বিজিবি মোতায়েন



শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবিতে সংঘর্ষ,ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বিজিবি মোতায়েন
ছবি:সংগৃহীত

গাজীপুর প্রতিনিধি: তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনার পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের শিল্পাঞ্চলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নতুন করে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।

রোববার (১ নভেম্বর) সকালে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, সফিপুর, কালিয়াকৈর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। আপাতত পাঁচ প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে বিজিবির প্লাটুন সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন। বিজিবি সদস্যরা শিল্প পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করবেন।

এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। দুপুর আড়াইটার দিকে শুরু হওয়া এ অবরোধ প্রায় তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয়। একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

যেভাবে শুরু হয় শ্রমিকদের আন্দোলন

পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে খাবারের বিরতির পর কাজে যোগ না দিয়ে ইন্টারস্টপ অ্যাপারেলস কারখানার শ্রমিকেরা প্রথমে মহাসড়কে অবস্থান নেন। তাঁদের দাবির মধ্যে ছিল ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। পরে পাশের ডিভাইন টেক্সটাইলসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন।

শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা মহাসড়কের ওপর মাটিভর্তি বস্তা, কাঠ ও বাঁশ ফেলে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। কোথাও কোথাও এসব সামগ্রীতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের উভয় পাশে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু তাঁদের দাবির বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি আগের তুলনায় ওভারটাইমের সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেক শ্রমিকের আয়ও কমেছে।

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আহত অন্তত ৩০

মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে পুলিশ ও শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে শ্রমিকেরা অবরোধ চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে পুলিশ শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় শ্রমিকদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিপেটার পাশাপাশি কয়েক দফা কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

সংঘর্ষের সময় পুলিশের একটি গাড়িসহ অন্তত ১৫টি যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের কয়েকজন স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন বলে জানা গেছে।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করা হয়। জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা

শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত অন্তত ২০টি পোশাক কারখানায় সাময়িক ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এতে কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে ছুটি ঘোষণার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও উত্তেজনা তৈরি হয়। ছুটি পাওয়া শ্রমিকদের একটি অংশ আন্দোলনে যোগ দেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশেও প্রভাব পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়।

মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট, ভোগান্তিতে যাত্রীরা

শ্রমিকদের অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আটকা পড়ে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন।

জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। অনেক যাত্রী বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও অসুস্থ যাত্রীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। পরিবহনশ্রমিকদেরও দীর্ঘ সময় সড়কে অপেক্ষা করতে হয়।

পরে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে শ্রমিকেরা মহাসড়ক থেকে সরে গেলে যানবাহন চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

বেতন বৃদ্ধির দাবিতে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ

শ্রমিকদের ভাষ্য, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে তাঁদের বেতন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি, বাড়িভাড়া ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বেড়ে যাওয়ায় মাসের আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় তাঁরা ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন।

শিল্পাঞ্চলের কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। নতুন করে মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগের কথা জানানো হলেও শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিভিন্ন কারখানায় উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও জানমালের ক্ষতি না হয়।

নিরাপত্তায় বিজিবি মোতায়েন

শ্রমিকদের অবরোধ ও সংঘর্ষের পর শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করতে বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, আপাতত পাঁচ প্লাটুন বিজিবি কোনাবাড়ী, সফিপুর, কালিয়াকৈর ও আশপাশের এলাকায় দায়িত্ব পালন করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হতে পারে। বিজিবি সদস্যরা শিল্প পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন।

আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বিজিবি মোতায়েন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এ সময়ে শিল্পকারখানার নিরাপত্তা, মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্ট মহলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শ্রমিকদের দাবি নিয়ে মালিকপক্ষ, সরকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর আলোচনা এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান না এলে শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিষয় : শ্রমিক আন্দোলন

আপনার মতামত লিখুন

ইছামতী

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬


শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবিতে সংঘর্ষ,ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বিজিবি মোতায়েন

প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

গাজীপুর প্রতিনিধি: তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনার পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের শিল্পাঞ্চলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নতুন করে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।

রোববার (১ নভেম্বর) সকালে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, সফিপুর, কালিয়াকৈর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। আপাতত পাঁচ প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে বিজিবির প্লাটুন সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন। বিজিবি সদস্যরা শিল্প পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করবেন।

এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। দুপুর আড়াইটার দিকে শুরু হওয়া এ অবরোধ প্রায় তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয়। একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

যেভাবে শুরু হয় শ্রমিকদের আন্দোলন

পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে খাবারের বিরতির পর কাজে যোগ না দিয়ে ইন্টারস্টপ অ্যাপারেলস কারখানার শ্রমিকেরা প্রথমে মহাসড়কে অবস্থান নেন। তাঁদের দাবির মধ্যে ছিল ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। পরে পাশের ডিভাইন টেক্সটাইলসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন।

শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা মহাসড়কের ওপর মাটিভর্তি বস্তা, কাঠ ও বাঁশ ফেলে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। কোথাও কোথাও এসব সামগ্রীতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের উভয় পাশে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু তাঁদের দাবির বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি আগের তুলনায় ওভারটাইমের সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেক শ্রমিকের আয়ও কমেছে।

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আহত অন্তত ৩০

মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে পুলিশ ও শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে শ্রমিকেরা অবরোধ চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে পুলিশ শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় শ্রমিকদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিপেটার পাশাপাশি কয়েক দফা কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

সংঘর্ষের সময় পুলিশের একটি গাড়িসহ অন্তত ১৫টি যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের কয়েকজন স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন বলে জানা গেছে।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করা হয়। জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা

শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত অন্তত ২০টি পোশাক কারখানায় সাময়িক ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এতে কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে ছুটি ঘোষণার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও উত্তেজনা তৈরি হয়। ছুটি পাওয়া শ্রমিকদের একটি অংশ আন্দোলনে যোগ দেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশেও প্রভাব পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়।

মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট, ভোগান্তিতে যাত্রীরা

শ্রমিকদের অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আটকা পড়ে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন।

জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। অনেক যাত্রী বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও অসুস্থ যাত্রীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। পরিবহনশ্রমিকদেরও দীর্ঘ সময় সড়কে অপেক্ষা করতে হয়।

পরে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে শ্রমিকেরা মহাসড়ক থেকে সরে গেলে যানবাহন চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

বেতন বৃদ্ধির দাবিতে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ

শ্রমিকদের ভাষ্য, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে তাঁদের বেতন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি, বাড়িভাড়া ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বেড়ে যাওয়ায় মাসের আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় তাঁরা ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন।

শিল্পাঞ্চলের কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। নতুন করে মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগের কথা জানানো হলেও শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিভিন্ন কারখানায় উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও জানমালের ক্ষতি না হয়।

নিরাপত্তায় বিজিবি মোতায়েন

শ্রমিকদের অবরোধ ও সংঘর্ষের পর শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করতে বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, আপাতত পাঁচ প্লাটুন বিজিবি কোনাবাড়ী, সফিপুর, কালিয়াকৈর ও আশপাশের এলাকায় দায়িত্ব পালন করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হতে পারে। বিজিবি সদস্যরা শিল্প পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন।

আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বিজিবি মোতায়েন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এ সময়ে শিল্পকারখানার নিরাপত্তা, মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্ট মহলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শ্রমিকদের দাবি নিয়ে মালিকপক্ষ, সরকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর আলোচনা এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান না এলে শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।



ইছামতী

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আরমান চৌধুরী
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ইছামতী